মোহাম্মদ মাকছুদ উল্লাহ ইসলামী খিলাফতের শেষ প্রদীপ, নবী পরিবারের সদস্য হজরত আলী (রা.) আরবের বিখ্যাত বংশ কুরাইশের মূল শাখা হাশেমি গোত্রে রাসুলে খোদা (সা.)-এর পিতৃব্য আবু তালেবের ঔরসে ৬০০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উপনাম ছিল আবুল হাসান ও আবু তোরাব। আর উপাধি ছিল আসাদুল্লাহ, হায়দার ও মুরতাজা। তাঁর মায়ের নাম ছিল ফাতিমা। কৈশোরে হজরত আলী (রা.) ইসলামের দীক্ষা নিয়ে মহান আদর্শ প্রচারে ব্রতী হন। একদিন তিনি সবিস্ময়ে দেখছিলেন, রাসুলে খোদা (সা.) ও হজরত খাদিজা (রা.) উপুড় হয়ে মাথা মাটিতে ঠেকিয়ে আছেন। অবাক হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী? রাসুল (সা.) উত্তর দিলেন, 'এক আল্লাহর ইবাদত করছি। আর তোমাকেও দাওয়াত দিচ্ছি।' হজরত আলী (রা.) সে দাওয়াত কবুল করে মুসলমান হয়ে গেলেন। তখন তাঁর বয়স ৯ থেকে ১১ বছরের মধ্যে। হজরত খাদিজা (রা.)-এর পর আলী (রা.) হলেন ইসলামের দ্বিতীয় এবং যুবকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান।
হজরত আলী (রা.) বাল্যকালে কিছু লেখাপড়াও শিখেছিলেন। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাতেবে ওহি দলের অন্যতম সদস্য। তাঁর মধ্যে অসাধারণ কাব্যপ্রতিভা ছিল। বিভিন্ন সময় তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। রাসুলে করিম (সা.)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠায় এবং কৈশোরে ইসলাম গ্রহণের ফলে জাহেলি যুগের কুপ্রভাব থেকে তাঁর চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁর রচনায় মূলত দ্বীনে ইসলামের মহিমাই ফুটে উঠেছে। সিহাহ সিত্তার গ্রন্থাবলিতে তাঁর কবিতার কিছু উদ্ধৃতি লক্ষ করা যায়। 'দিওয়ানে আলী' শিরোনামে হজরত আলীর কবিতাসংগ্রহ বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পাঠ্য তালিকাভুক্ত রয়েছে। 'দিওয়ানে আলী' আরবি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, 'অর্থ দিয়া না হইলেও তিনি অসি ও মসি দিয়া ইসলামের সেবা করেন।' ইসলাম গ্রহণের কারণে হজরত আলী (রা.)কেও অন্যান্য মুসলমানের মতো কাফির ও মুশরিকদের সীমাহীন নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। কাফিরদের সীমাহীন নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলমানরা প্রথমে হাবশায়, অতঃপর মদিনায় হিজরত করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)ও হিজরতের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। হজরত আলী (রা.) তখন রাসুলে কাারিম (সা.)-এর সঙ্গে মক্কায় অবস্থান করছিলেন। একদিন মক্কার কাফিররা সম্মিলিতভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)কে হত্যার সিদ্ধান্ত নিল। আল্লাহতায়ালা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে স্বীয় রাসুলকে কাফিরদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে তাঁকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কাফিররা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘর রাতের বেলা চারদিক থেকে ঘিরে রাসুল (সা.)কে হত্যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সকালের অপেক্ষায় থাকল। ওদিকে রাসুলে কারিম (সা.) হজরত আলী (রা.)কে বললেন, 'হিজরতের নির্দেশ এসেছে। আমি আবু বকরকে নিয়ে মদিনার পথে যাত্রা করছি। তুমি আমার হাজারামি চাদরটি জড়িয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকবে। আমার কাছে রক্ষিত মক্কাবাসীর আমানতগুলো মালিকদের কাছে পেঁৗছে দিয়ে তুমি মদিনায় আমাদের সঙ্গে মিলিত হবে।' ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান লিখেছেন, 'রাসুলে কারিম (সা.) মদিনায় হিজরত করিলে নিজের জীবনকে বিপন্ন করিয়া তিনি রাসুলের শয্যায় শায়িত ছিলেন। রাসুলুল্লাহ রাত্রিতে নিরাপদে মক্কা ত্যাগ করিলে শত্রুগণ পরদিন প্রত্যুষে হজরত আলীকে তাঁহার শয্যায় দেখিতে পাইয়া যুগপৎ বিস্মিত ও হতাশ হয়। বিধর্মীদের উদ্দেশ্য ব্যাহত করিয়া তিনি পরে মদিনায় গিয়া মহানবীর সঙ্গে মিলিত হন।'
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)কে হজরত আলী (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের সময় খাতুনে জান্নাতের বয়স ছিল ১৫ বছর পাঁচ মাস ১৫ দিন। আর হজরত আলীর বয়স হয়েছিল ২১ বছর পাঁচ মাস। হজরত ফাতেমা (রা.)-এর গর্ভে হাসান, হুসাইন ও মহসিন নামে হজরত আলীর তিন পুত্রসন্তান এবং জয়নাব ও উম্মে কুলসুম নামে দুটি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। মহসিন (রা.) বাল্যকালেই ইন্তেকাল করেন। হজরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর বংশধররা সৈয়দ নামে পরিচিত ছিল। হজরত ফাতেমা (রা.)-এর ইন্তেকালের পর হজরত আলী (রা.) অন্যত্র বিয়ে করেন এবং তাঁর ঔরসে আরো কয়েকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করেন।
তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান (রা.) বিদ্রোহীদের দ্বারা নির্মমভাবে শাহাদাৎবরণের পর মুসলিম সাম্রাজ্যজুড়ে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়। হাশেমি-উমাইয়া দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। একদিকে হজরত ওসমান (রা.)-এর বিরোধীদের মারাত্দক আস্ফালন, অন্যদিকে ওসমান হত্যার প্রতিশোধকামীদের ওসমান (রা.)-এর রক্তমাখা পোশাক ও তাঁর স্ত্রী নায়লার কর্তিত আঙুল জনসমক্ষে প্রদর্শন করে জনরোষ সৃষ্টিতে বাড়াবাড়ি_সব মিলিয়ে ইসলামী খেলাফতের এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে যখন রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রত্যয়িত মহান ব্যক্তিরা তালহা, যুবাইরসহ কেউই খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণে সম্মত হলেন না, তখন মদিনার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপর্যুপরি অনুরোধ ও বিদ্রোহীদের চাপে শেষ পর্যন্ত হজরত আলী (রা.) ইসলামী খেলাফতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পঞ্চম দিনে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
হজরত আলী (রা.) খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করে মারাত্দক সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তাঁর হাতে যদিও পুরো মদিনাবাসী আনুগত্যের বায়াাত গ্রহণ করেছিল, তার পরও খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তারা সে শপথের কথা বিস্মৃত হয়ে যায়। হজরত ওসমান (রা.)-এর হত্যাকারীদের বিচারের দাবি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। হজরত আলী (রা.) হত্যাকারীদের বিচারবিধানে শতভাগ আন্তরিক ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত অজ্ঞাতসংখ্যক ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকারীকে চিহ্নিত করে বিচারের সম্মুখীন করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। আর ইসলামী সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহ দমন তাঁর কাছে বেশি জরুরি বলে মনে হয়েছিল। তাই হজরত আলী (রা.) হত্যাকারীদের বিচারের বিষয়ে সময়ক্ষেপণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর এটাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। হজরত আয়েশা (রা.) এবং আশারায়ে মুবাশশিরার অন্যতম হজরত তালহা ও যুবাইর (রা.)ও বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। হজরত আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে হত্যাকারীদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালো হয়ে ওঠে। সিরিয়ার শাসনকর্তা হজরত মুয়াবিয়া (রা.) হজরত আলী (রা.)-এর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের ঘোষণা দেন। নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক ভুলবোঝাবুঝির কারণে এবং তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের ইন্ধন যুক্ত হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুসলমানরা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের কথা বিস্মৃত হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ ও একে অন্যকে হত্যার নেশায় মেতে ওঠে। ফলে ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে উষ্ট্রের যুদ্ধ ও ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিফ্ফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। গৃহযুদ্ধে রাসুল (সা.) কর্তৃক প্রত্যয়িত তালহা, যুবাইর ও অনেক বয়োবৃদ্ধ সাহাবাসহ লক্ষাধিক মুসলমান নিহত হন। কার্যত ইসলামী খেলাফত অত্যন্ত দ্রুত অন্তিম সময়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
সিফ্ফিনের যুদ্ধের পর 'দুমাতুল জানদালে' ইসলামী খেলাফতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বৈঠককালে ১২ হাজার সৈন্যের একটি শক্তিশালী বাহিনী খলিফার পক্ষ ত্যাগ করে। ইসলামে 'খারেজি' নামে উগ্রপন্থী সম্প্রদায়ের উদ্ভব তাদের থেকেই। খারেজি সম্প্রদায় মুসলিম মিল্লাতের জাতীয় শত্রু হিসেবে হজরত আলী, মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আস (রা.)কে চিহ্নিত করে তাঁদের একই দিন ও অভিন্ন সময়ে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আসন্ন মাহে রমজানের ১৫ তারিখ ফজরের নামাজের সময় আক্রমণ পরিচালনার সময় নির্ধারিত হয়। আততায়ীরা নির্দিষ্ট সময়ে বয়োবৃদ্ধ তিন সাহাবির ওপর হামলা করে। সৌভাগ্যক্রমে আমর ইবনুল আস (রা.) অসুস্থতার কারণে সেদিন মসজিদেই যাননি। আর মুয়াবিয়া (রা.) আততায়ীর আক্রমণে সামান্য আহত হলেও বেঁচে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত হজরত আলী (রা.) ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি শাহাদাৎ বরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। হজরত হাসান ইবনে আলী (রা.) তাঁর জানাজায় ইমামতি করেন এবং কুফা জামে মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
সরলতা ও আত্দত্যাগের প্রতীক ছিলেন হজরত আলী (রা.)। মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও নিজ হাতে তাঁকে ও ফাতেমা (রা.)কে কাজ করতে হতো। দাস-দাসী কোনো দিনই তাঁর ঘরে ছিল না। ইতিহাসবিদ হিট্টি বলেছেন, 'আলী (রা.) ছিলেন যুদ্ধে সাহসী, পরামর্শদানে বিজ্ঞ, বক্তৃতায় স্বচ্ছ, সাবলীল, বন্ধুদের প্রতি অকপট এবং শত্রুদের প্রতি দয়াশীল। আলী (রা.) মাহাত্দ্য ও শৌর্য-বীর্যের নিদর্শনস্বরূপ ছিলেন।' মাসুদী বলেন, 'আল্লাহ তাঁহাকে যে গুণাবলি দ্বারা ভূষিত করেন, তাঁহার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী (একমাত্র রাসুলে কারিম ছাড়া) অন্য কারো মধ্যে আমরা খুঁজিয়া পাইব না।' বস্তুত হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে খোলাফায়ে রাশেদিনের সমাপ্তি ঘটে।
লেখক : পেশ ইমাম ও খতিব, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ
<< সকল মুসলিম ভাইবোনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি >>
বিশ্বের সকল মুসলিম ভাইবোনদের প্রতি আমার সালাম রইল। ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত এক মহান ধর্ম। এই ধর্মকে একমাত্র আল্লাহই কেয়ামত পর্যন্ত রক্ষা করবেন এবং সারা বিশ্ব ব্যাপী প্রসারিত করবেন। ইন্টারনেট/ ফেইসবুকের মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় কত অসাধ্যকে সম্ভব করা হচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই। আমি আমার জন্মস্থান ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার জনবহুল গ্রাম তেলীগ্রামে একটি দৃষ্টি নন্দন মসজিদ এবং রাজনীতিমুক্ত একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখেছি সেই ছোট বেলা থেকেই। আমার এই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমি সারা বিশ্বের সকল মুসলিম ভাইদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি। আপনারা সকলে যদি সহানুভূতিশীল হয়ে দান করার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন তাহলে পৃথিবীতে মানবসৃষ্ট শ্রেষ্ট মসজিদও আল্লাহপাকের রহমতে আমরা নির্মান করতে পারবো। দানে বিপদ কাঁটে, দানে সম্মান বাড়ে, দানে সম্পদ বৃদ্ধি পায় আর আখেরাতে উত্তম পুরস্কারতো আছেই। যারা পঞ্চাশ হাজার টাকা বা তার বেশী এককালীন দান করবেন তাঁদের সকলের নাম মসজিদের সামনে বিশেষ গম্বুজে শ্বেত পাথরে খোদাই করে লিখে রাখা হবে। এই মসজিদ আল্লাহপাক যতদিন চালু রাখবেন প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর সকল দাতাদের জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হবে। যাদের সামর্থ আছে তারা তাদের সাধ্যমত দান করবেন এবং সকলেই আমার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করবেন যেন আমি সততার সাথে আমার স্বপ্নকে পুরন করতে পারি। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর জন্য “দানে বিপদ কাঁটে, দানে সম্মান বাড়ে” শিরোনামে একটি আলাদা পেইজ আছে তাতে ক্লিক করুন।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment