লিখিত পরীক্ষা, শেষ সময়ে কৌশলই এগিয়ে রাখবে
দরজায় কড়া নাড়ছে পরীক্ষা! এ সময় আর নতুন করে তেমন কিছু পড়ার নেই। এত দিন যা প্রস্তুতি নিয়েছেন, এবার শুধু সেসব বিষয় ঝালিয়ে নেওয়ার পালা। পরীক্ষায় টিকতে পারলেই কেবল পরবর্তী ধাপ মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া যাবে। তাই এ পরীক্ষায় ভালো করার কোনো বিকল্প নেই। তবে এর জন্য শুধু প্রস্তুতি নয়, আপনাকে কৌশলীও হতে হবে। শেষ সময়ে কৌশলই এগিয়ে রাখবে আপনাকে!প্রতিটি বিষয়েই সমান গুরুত্ব
২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকারী মো. রেজাউল করিম জানালেন, প্রতিটি বিষয়ে মৌলিক ধারণা থাকতে হবে। যেমন ধরা যাক, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিষয়ে কোনো প্রশ্ন এল। সেটি মুখস্থ না করে আপনি যদি লাইন বাই লাইন পড়ে যান, তাহলেও কিন্তু পরীক্ষার খাতায় আপনার মতো করে সাজিয়ে লিখতে পারবেন। পরীক্ষায় এক নম্বর কম পাওয়া মানে কিন্তু প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে পড়া!
বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ জানতে হবে
লিখিত পরীক্ষায় বাংলা প্রথম পত্রে বাগধারা, প্রবাদ-প্রবচন, বাক্য পরিবর্তন, শূন্যস্থান পূরণ, পারিভাষিক শব্দ, ভাব সম্প্রসারণ, সারাংশ এবং ভাষা ও সাহিত্য থেকে বেশি প্রশ্ন থাকবে। শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে পারলে যেকোনো ধরনের প্রশ্নই হোক, এসব বিষয়ে ভালো করা কঠিন নয়।
ইংরেজিতে দক্ষতাই যথেষ্ট
মো. রেজাউল করিম জানালেন, ইংরেজিতে দক্ষতা যাঁর যত বেশি, তিনি তত ভালো করবেন। পরীক্ষার আগে 'ফ্রি হ্যান্ড রাইটিং'য়ের অভ্যাস করতে হবে। গ্রামার অংশে যেসব বিষয়ের ওপর প্রশ্ন আসে, সেসব বিষয় বারবার দেখতে হবে। প্রথম পত্রে ইংরেজি থেকে বাংলা ও বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ, অ্যামপ্লিফিকেশন, সাবস্ট্যান্স রাইটিং ও গ্রামার বিষয়ক প্রশ্ন হবে। দ্বিতীয় পত্রে দুটি ইংরেজি রচনা, অবজেকটিভ রিপোর্টিং, লেটার রাইটিং থাকে। ইংরেজি পত্রিকা, ম্যাগাজিন পড়লে এবং বিবিসি শুনলে তা শেষ সময়ের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।
সাধারণ জ্ঞানে মৌলিক ধারণা
২৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মো. কামরুল হাসান জানালেন, পরীক্ষার আগের কয়েক দিন পড়া বিষয়গুলো একঝলক দেখে নিতে পারেন। শেষ সময়ের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ধারণা নিয়ে যেতে হবে। পত্রপত্রিকায় চোখ রাখলে ও নিয়মিত খবর শুনলে সাধারণ জ্ঞানে ভালো করা যাবে; বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় বেশ কাজে লাগে।
গণিতের জন্য বারবার চর্চা
গাণিতিক যুক্তি অংশে পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি_এ তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন থাকে। মানসিক দক্ষতা পরীক্ষায় প্রার্থীর মানসিকতা, বুদ্ধিমত্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা_এসব বিষয় যাচাই করা হয়। মো. রেজাউল করিম বললেন, 'এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় জরুরি, একটি হলো আমি অঙ্ক পারি কি না, আরেকটি হলো অঙ্ক কত দ্রুত করতে পারি। আর এর জন্য চাই চর্চা, চর্চা আর চর্চা। আর একটি অঙ্ক অনেক নিয়মে করা যায়। জটিল কোনো নিয়মে না গিয়ে সংক্ষেপে ও শুদ্ধ নিয়মে করাটাই হবে যুদ্ধে জেতার সহজ কৌশল।'
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ঝালিয়ে নিন
সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে দৈনন্দিন বিজ্ঞান, আলোর প্রকৃতি, তরঙ্গদৈর্ঘ্য, শব্দ, চুম্বক ও মেরু, রোগব্যাধি, স্বাস্থ্য, বায়ুমণ্ডল, পানি ও শব্দদূষণ_ইত্যাদি ভালোভাবে দেখে যেতে হবে। প্রযুক্তি অংশে কম্পিউটার প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি_এসব বিষয়ে প্রশ্ন থাকবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এসব বিষয় বারবার পড়তে হবে, বললেন কামরুল হাসান।
নিজের বিষয়টাও জানতে হবে
পেশাজীবী বা কারিগরি ক্যাডারে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ে ২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হবে। যিনি যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর সে বিষয়ে ভালো ধারণা থাকলে এ ক্ষেত্রে ভালো করা কঠিন নয়। পাঠ্যক্রম অনুসারে আগের পড়া বিষয়গুলো বারবার ঝালিয়ে নিলে এ পরীক্ষায় ভালো করা আপনার জন্য অনেকটাই সহজ হবে।
প্রশ্ন নির্বাচন ও উত্তর
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক সদস্য মো. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী বলছিলেন, 'অনেকেই প্রশ্ন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখা শুরু করে দেয়। এটা মোটেও ঠিক নয়। প্রথম ১০ মিনিট প্রশ্নপত্র পুরোটা ভালোভাবে পড়তে হবে। এরপর ঠিক করতে হবে কোন প্রশ্নের উত্তর আগে দেব।' এ বিষয়ে মো. রেজাউল করিমের কথা হলো, 'কোন প্রশ্নের উত্তর লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে এবং সময়ও বেশি লাগবে না, তা জানতে হবে। আর বাছাইয়ের সময় এমন প্রশ্ন বেছে নেওয়াই ভালো, যেগুলোর উত্তর অপেক্ষাকৃত ছোট হয় ও সুনির্দিষ্টভাবে লেখা যায়।'
সময় ব্যবস্থাপনা
লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত তিন ঘণ্টা সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মো. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী জানালেন, বিসিএস পরীক্ষায় সময় ব্যবস্থাপনা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরো উত্তর করে না এলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে তিনি বলছিলেন, '৮০ ভাগ ভালো লিখে যে নম্বর পাওয়া যাবে, ১০০ ভাগ মোটামুটি লিখে তার চেয়ে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে।' আগে থেকেই প্রতিটি প্রশ্নের জন্য সময় নির্ধারণ করে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন তিনি।
উত্তর সুন্দরভাবে উপস্থাপন
আপনি কতটুকু জানেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরীক্ষার খাতায় কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করলেন। সুন্দরভাবে উপস্থাপনার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করে। অভিজ্ঞদের মতে, খাতাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটি দেখেই যেন পরীক্ষকের মনে হয়, একটু পড়ি। তাই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সুন্দর-সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে হবে। হাতের লেখা সুন্দর হতে হবে এমন নয়, তবে গুছিয়ে ও পরিচ্ছন্নভাবে প্রশ্নের উত্তর লিখলে পরীক্ষক আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবেন; অন্যথায় খাতাটিকে বাড়তি কোনো গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন না।
ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশল
'খাতা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় মার্জিন দিতে হবে। উত্তর লেখার সময় খেয়াল করতে হবে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়ই যেন কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০টি লাইন থাকে। একটি প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ হলে সেই পৃষ্ঠায়ই পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর শুরু না করে পরের পৃষ্ঠায় চলে যেতে হবে।
প্রতিটি প্রশ্নের সূচনা ও উপসংহারে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, এটি পরীক্ষক ভালো করে দেখেন।' বলছিলেন মো. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী।
No comments:
Post a Comment